ঘূর্ণিঝড় ভবিষ্যতের এক মাত্র শক্তির উৎস।

CGvortex04_Courtesy Craig Gloverপ্রকৃতিকেবশ মানিয়ে তার বিধ্বংসী রূপকে মানুষের ব্যবহার্য উপকারী শক্তিতে রূপান্তরকরে এসেছেন বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে। এ থেকেই এসেছে সূর্যের আলো থেকেসৌরশক্তি, পানি এবং বায়ুর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি।কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়! কখনো মৌসুমি ঘূর্ণিঝড়েরধ্বংসলীলা দেখে আপনার কি মনে হয়েছে এর থেকে ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপাদনকরা যাবে? আপনার কাছে একে পাগলামি মনে হলেও এমন একজন মানুষ আসলেই আছেন যিনিএই ঘূর্ণিঝড় থেকেই শক্তি উৎপাদন করতে বদ্ধপরিকর! তার নাম হল লুইস মিচাউদ।

 

বৃদ্ধ বয়সে রিটায়ার করার পর মানুষ সাধারণত কি করে? তাদের ছোটনাতিপুতিদের সাথে সময় কাটান অথবা খবরের কাগজ পড়েন? কিন্তু ৭২ বছর বয়সীকানাডীয় মিচাউদ এর ধারে কাছেও নেই। তিনি তার সময়ের সিংহভাগ ব্যয় করেচলেছেন টর্নেডো অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড় তৈরির প্রচেষ্টায়। এমনই ঘূর্ণিঝড় তিনিতৈরি করছেন যা থেকে উৎপাদন করা যাবে শক্তি!

মিচাউদ অনেক আগে থেকেই শক্তির বিকল্প উৎস খোঁজার প্রতি আগ্রহী ছিলেন।তিনি যখন ExxonMobil এর এঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন তখন থেকেই তিনিঘূর্ণিঝড়ের এই চরম গতিবেগের বায়ুপ্রবাহ থেকে শক্তি উৎপাদনের চিন্তা করেন।বায়ুপ্রবাহ উপরের দিকে ওঠার সময়ে যে বাষ্প ঘনীভূত হয় তা থেকে শক্তিসংগ্রহ করা যাবে- এটা ছিল তার তত্ব। কিন্তু তিনি দেখলেন এর চাইতেনিয়ন্ত্রিত একটা ঘূর্ণি তৈরি করে তা থেকে টারবাইনের মাধ্যমে শক্তি সংগ্রহকরা অনেক বেশি সহজ হবে। তার তৈরি প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি হয় ২০০৫ সালে। এরনাম Atmospheric Vortex Engine (AVE) যেটা তৈরি করতে পারে মিনি-টর্নেডোএরপর তিনি নিজের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন যার নাম AVEtech

image[12]মিচাউদ এর তৈরি প্রোটোটাইপকে বলা যেতে পারে একটা ভরটেক্স এঞ্জিন।প্লাইউড দিয়ে তৈরি এই কাঠামোর আকৃতি হল মোটে দুই ফিট লম্বা এবং ৪ ফিটলম্বা। কিন্তু এর ক্ষমতা আছে ছোট ছোট ঘূর্ণি তৈরি করার।

 

এখন পর্যন্ত সাতটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন তিনি যেগুলো ২০ মিটারেরচাইতে ছোট ঘূর্ণি তৈরি করতে সক্ষম। এই প্রোটোটাইপ দিয়ে তৈরি ঘূর্ণি থেকেবিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব নয় কিন্তু মিচাউদ মনে করছেন, যথেষ্ট বড় করে তৈরি করতেপারলে এবং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই ঘূর্ণি থেকেই সম্ভবভবিষ্যতের শক্তির চাহিদা মেটানো। আকাশ-কুসুম চিন্তা মনে হলেও তার এইপ্রজেক্ট ইতোমধ্যেই পাচ্ছে পিটার থিয়েল নামের এক বিলিয়নিয়ার এর সহায়তা।এখন দেখার পালা মিচাউদ সত্যি সত্যিই এই অসাধারণ যন্ত্র তৈরি করতে পারবেনকি না।

ঘূর্ণিঝড় কিভাবে তৈরি হয়? মাটির কাছের তাপমাত্রা যখন ওপরের তাপমাত্রারচাইতে কমপক্ষে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয় তখন এই উষ্ণ এবং হালকা বায়ুওপরে উঠে যেতে শুরু করে এবং এত দ্রুত ঘুরতে শুরু করে যে এ থেকে জন্ম নেয়ঘূর্ণিঝড়। নিজের AVE যন্ত্রে একই রকমভাবে ঘূর্ণি তৈরি করতে মিচাউদ তৈরিকরেন একটি সিলিন্ডার এবং এর নিচে থেকে ভেতরে প্রবেশ করানো হয় উষ্ণ বায়ু।এই বায়ু ঘুরতে ঘুরতে ওপরে উঠতে থাকে এবং বায়ুর সরবরাহ বাড়তে থাকলে এরউচ্চতাও বাড়ে। এর ওপরের অংশে বায়ুপ্রবাহের বেগ এতই বেশি হবে যে টারবাইনেরমাধ্যমে এটি শক্তি উৎপাদন করতে পারবে।

 

এই প্রযুক্তিকে কিভাবে বানিজ্যিকিকরন করা যাবে? বিভিন্ন কলকারখানায় যেউষ্ণ বায়ু তৈরি হয় তা কোনও কাজে লাগে না বরং এদের ঠাণ্ডা করতে অতিরিক্তপানি লাগে। কিন্তু এই বায়ু যদি সরবরাহ করা যায় AVE মেশিনে ঘূর্ণি তৈরিতেতবে দুই পক্ষই উপকৃত হবে। আর এভাবে তৈরি করা হলে যে ঘূর্ণি উৎপাদিত হবে তারউচ্চতা ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে! আর এত বড় ঘূর্ণি থেকে উৎপাদিতশক্তির পরিমাণও যে অনেক বেশি হবে তা বলাই বাহুল্য। নিউক্লিয়ার শক্তি বাজীবাশ্ম শক্তির চাইতে এর কার্যকারিতার মাত্রা হবে বহুগুণে বেশি।LM-6-AVEtec-451x620

মিচাউদ নিজের এই প্রযুক্তি নিয়ে অনেক আশাবাদী হলেও এর ব্যাপারে চিন্তিতএবং কিছুটা ভীত হলেন ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান এর অধ্যাপক নিল্টন রেনো।বায়ুমণ্ডলীয় পরিচলন সম্পর্কিত একজন বিশেষজ্ঞ তিনি। AVE এর মাধ্যমেবিশালাকৃতির ঘূর্ণি তৈরি যে সম্ভব এটা তিনি মানছেন। কিন্তু এই দানবকেনিয়ন্ত্রণ করা যাবে কি না তা নিয়ে তিনি যথেষ্টই সন্দিহান। এবং একেনিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে সেটাই তারদুশ্চিন্তার কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *